"ফাঁসির পূর্ব মুহুর্ত"
মোঃ নজরুল ইসলাম
(একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্ণধর কিভাবে খুনী হলো আর তার ফাঁসির পূর্বে জল্লাদের সাথে আলাপচারিতা।,প্রথম জন ফাঁসির আসামী,দ্বিতীয় জন জল্লাদ,যে কিছুক্ষন পর ফাঁসির রায় কার্যকর করবে।)
-(আসামী)জন্মগত ভাবে কেউ খুনী নয়,সে খুনী হয়' যার অন্তরালে কিছু কারন থাকে। কিন্তু আমরা তা দেখি না।
--(জল্লাদ) হুম।অনেক দামি কথা বলেছেন।তো আপনি কেনো হলেন?
-সে অনেক কারন আছে।আর ওসব শুনে কি হবে?
--আমার দরকার আছে।
-না দরকার নেই।আমার তো ফাঁসির রায় হয়ে গেছে।যত দ্রুতই কার্যকর হয় ততই ভালো।
-- আজব তো আপনি!সেই বিচারলয় থেকে দেখছি।অকপটে নিজের দোষ স্বীকার করে নিচ্ছেন।
- হ্যাঁ নিচ্ছি।
-- কেনো নিচ্ছেন?
-সেটা আপনা জানার দরকার নেই।
--আপনি কেনো কোনো লয়ার ধরেন নি?
-কি লাভ তাতে?
--কেন আপনি মুক্তি পেতে চান না?
-না!আমি মুক্তি পেলে আরো ডর্জন খানিক খুন করবো।তার থেকে নিজে চলে যায়।
--তার মানে? কেনো আপনি খুন করবেন?
-দেখুন বাবু আমাকে এত বকাবেন না।আর শুকনো গলাতে কথা বলতে পারি না।
--পানি পান করবেন?
-হুম।তবে সাদা পানি।
--ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি।
-ঠিক আছে আগে আনুন।
--এই নিন।
-হুম।এবার বলুন কি জানতে চান?
--আপনার পরিচয় বলুন!
-একটা শান্ত শিষ্ট মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম।
--আপনার বাবা মা আছেন?
-জানি না।বহু দিন তাদের সন্ধান পাই নি।
--আপনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে লেখা পড়া জানেন।
-হুম।B.s.s in MA complete।
--রেজাল্ট কি ছিল?
-ফাস্ট ক্লাস।
--বাহ্।তার মানে আপনি তো মেধাবী শিক্ষিত।তবে কেনো খুনী।তাও আবার পেশাদার খুনী হলেন?
-দেখুন!আমি খুব ভালো ছিলাম।পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম।রোজা রাখতাম
--সে তো ভালো কাজ।তার পর?
-বাবা একা সংসার সামলাতে পারতেন না।তাই জমি জমা বিক্রি করে বিদেশ যেতে চাইলেন।কিন্তু দালাল টাকা মেরে দিল।এমন কি তাকে ১৯ দিন পর মিরপুর ১ এর শাহ আলী মার্কেটের দুতলা থেকে র্যাবে অঙ্গান অবস্থাতে উদ্ধার করে ২০০৮ সালে।
-- তারপর?
-তাকে ফিরে পাই কিন্তু বাঁচা মরার মতন
চিকিৎসার জন্য বহু টাকার দরকার ছিল।কিন্তু আমাদের তেমন কিছুই ছিল না।বাধ্য হয়ে ভিটের অর্ধেক বিক্রি করে দিয়।
--সে টাকা দিয়ে বাবাকে চিকিৎসার কাজ করেন তাইতো?
-হুম।তার মধ্য মায়ের প্যারালাইসিস হয়।মহা বিপদে পড়ি।পরিবারে মোট ছয় জন সদস্য ছিলাম।
--কে কে?
- মা বাবা, আমি, দাদী, ছোট ছোট ভাই -বোন। বড় কষ্টে দিন যাচ্ছিল।তখন কাউকে পাশে পাই নি।কিন্তু আমার স্বপ্নও ছিলো।
--তখন কি করলেন?
- সকাল সন্ধ্যা ৪০ টাকার জন দিতাম।৪৫ টাকা চাউলের কেজি ২২ টাকা খুদের কেজি ফখরুদ্দীনের শাষন আমল।তাই খুদ কিনতাম।আর কোন মতে চলতাম।বহু বার ক্ষুদার যন্ত্রনাতে মাথা ঘুরে পড়েছি। কিন্তু হাল ছাড়ি নি।
--এত কষ্টের মধ্যও লেখাপড়া কি ভাবে করতেন?
- শুধু পরিক্ষার সময় পরিক্ষা দিতাম।স্যাররা ভালো ছিল।স্কুল থেকে পুরানো বই দিত।
-- ভালোতো।ছোট ভাই বোনেরা?
- ওরা স্কুলে যেত।সবার পড়াশুনা চালিয়েছি।বোন কে অনার্সের পর বিয়ে দিয়েছি।ভাইটাকে টেকনোলোজিস্ট বানিয়েছি।
--আপনি তো অনেক সংগ্রামী।
-আরে কি বলেন, যা তা।তার পর বিক্রি করা সম্পত্তি খরিদ করেছি।দালান করেছি,অনেক সুখে ছিলাম।ছাত্র জীবনেই সব করেছি।
--কি ভাবে টাকা ইনকাম করতেন?
-আরে বাবু ইচ্ছে থাকলে সব হয়।সৎ নিয়ত আর মনোবল,সব সম্ভাব।
--হুম তা সত্য।কিন্তু আপনি তো রবার্ট ব্রুস কেও হার মানিয়ে দিলেন।তবে ইনকামের সোর্স বলবেন?
- সকালে রাতে কচিং করাতাম।সারাদির জন দিতাম।মাঝে মধ্য গ্রাম্য ডাক্তারি করতাম।এমন কি পাইলস,অশ্ব, দাঁতের ও যৌন চিকিৎসার জন্য বেশ পরিচত ছিলাম।হাতের সব কাজই পারতাম,কারেন্টের বলেন,রাজের, বলেন,দর্জি বলেন কৃষি বলেন,সবই করতাম।
--আপনি তো অষ্ট ধাতুর মাদুলি
-জানি না!মাঝে মধ্য লিখতাম।
--কি লিখতেন?
-কবিতা।
--কোথাই লিখতেন?
-ফেসবুকে,ম্যাগাজিনে ,যৌথগ্রন্থে।
--আরে আপনি তো বেকাইদা মানুষ।
-আরে রাখেন,ম!
--দু লাইন বলেন কবিতা!
-"যাযাবর কবিবর যেনতার নেশা
চোরাচর বালুচর ভাটা-জোঁয়ার যেন তার পেঁষা"
--বাহ চমৎকার তো!
-জানি না।
--তারপর কি হলো?
-ফেসবুকে এক যুবতী কবির সাথে পরিচয়।তখন আমি এম এ পড়ি।তার সাথে সম্পর্কে জঁড়িয়ে যায়।সে অনেক বড় লোকের মেয়ে,আবার বড় ডাক্তার হলো।
--কেনো সম্পর্কে জড়ালেন?
-আমি জড়াতে চাই নি!সে আমাকে নিয়ে খেলেছে।অবশেষে সে মিথ্যা অভিযোগে সরে গেছে।অথচ সে ধর্ম কুরান,সব কিছুর কছম দিয়ে সম্পর্কে জাড়ায়।তখন আমার প্রেমে অন্ধ ছিল।যখন আমার সরকারি চাকুরি না হয় তখন সে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।চার বছরের সম্পর্কে আগুন ধরায়।তারপর আমি হঁতাশ হয়ে নেশা করতে শুরু করি।তখন আমি চাকরির খোঁজে ঢাকাতে থাকতাম।তার এ নিষ্ঠুর ব্যাবহারে আমি পাগল হয়ে যায়।আমি চারিদিকে অন্ধকার দেখি।
--তারপর? আপনি কেনো আপনি ভেঙে পড়লেন? আপনি তো অনেক সাহসী পুরুষ, সংগ্রামী মানুষ।
-তার সাথে যে জবান দিয়েছি তা বেঈমানি হবার জন্য বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম।আর মন দিয়ে তাকে ভালোবাসতাম।কিন্তু নারী যে অর্থলোভী তা বুঝতে পারিনী।
--হুম নারীরা একটু অর্থলোভী হয়।
-তারপর বাড়ির সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।
--কেনো?
-পরিবার বলে ঐ মেয়ে কে ছাড়া যেনো বিয়ে না করি।মা জন্মের কছম দেয়।কিন্তু আমার সাথে ঐ মেয়ের কোন যোগাযোগ ছিল না।সে সব কিছু চেন্জ করে নেই।তখন আমি রাস্তাতে ঘুরি।পকেট মারা শুরু করি।তারপর আস্তে আস্তে এ পর্যন্ত আসি।
--জীবনে কতটা খুন করেছেন?
-হিসাব নেই।ঢাকার যত বড় অপারেশন হতো তার প্রথমেই আমি থাকতাম।
--পকেট মার থেকে খুনী কি ভাবে হলেন?
-আরে আপনি বোকা নাকি? বাংলাদেশের রাজনীতি বোঝেন না? আর আমি টাকার জন্য সব করতে পারতাম।যে টাকার জন্য পবিত্র ভালাবাসা অপবিত্র হয়।সে টাকা আমি না চিনে মরতে পারি না।সব বস্তিতে যান। আমাকে এক নামে চেনে।আমি তাদের থেকে চাঁদাবাজি করতাম যারা কোটিপতি। তা নিয়ে বস্তিতে বিলিয়ে দিতাম।মোটা টাকার বিনিময় অপারেশন করতাম।সে টাকা এয়াতিম খানাতে দিতাম।জীবনে নিজের জন্য কিছুই করে নি।
--তখন কি আপনি বাড়িতে টাকা দিতেন না?
- না।হারামের টাকা আমার শরীরে গেলেও বাড়িতে দিতাম না।এমন কি আর যোগাযোগ করতাম না।মাত্র দু বছরে ঢাকার প্রথম সারির আন্ডার গ্রাউন্ডেে মাস্টার হয়ে যায়।
--বেশ নাটকীয় জীবন আপনার।
-হুম!তারপর এই শেষ অপারেশন টা করে ফেরার পথে এক এয়াতিমের কাছে ধরা পড়ি।যা কারনে র্যাব আমাকে ধরতে পারে।না হলে কখনই না।এই প্রথম জেলে ঢুকি।তাই ভেবেছি আর বের হবো না।
--এয়াতিম কি ভাবে ধরলো আপনাকে?
-অপারেশন শেষে ফেরার সময় পুঁলিশেরর সাথে গোলাগুলি চলে।পালিয়ে আসার সময় ঐ এয়াতীম গুলিবিদ্ধ হয়।ওকে বাঁচাতে যেয়ে রক্তের দাগ দেখে পুঁলিশ মিলে র্যাব ধরে ফেলে।
--ওহ্! আপনি কি আপনার ঐ মানুষটির কোন ক্ষতি করেছেন?
-না!কেনো করবো?তাকে তো আজ ও ভালোবাসি।তাকে যদি ক্ষতিই করবো তবে তো আমিও তো তার মতন বেঈমান নিচু হয়ে যাবো।কেনো আমার ভালোবাসাকে অপমানিত করবো?
--বুঝতে পেরেছি।আপনার জীবন বিরহ থেকে ফুলের মতন হলো তারপর একটি মেয়ের কারনে আজ ফাঁসির দঁড়িতে ঝুলতে যাচ্ছেন।কিন্তু তার পরিচয় দেন!আমরা তার সাথে যোগাযোগ করবো।
-কেনো?
-- আপনার ফাঁসির পর লাশটা তো বেঅরিশ হয়ে যাবে।তার থেকে তার হাতে তুলে দেব মৃত দেহ।
-আরে মশায় দরকার নেই।লাশ টা রাস্তাতে ফেলে দেবেন শিঁয়াল কুকুরে দুদিন পেট ভরে খেতে পারবে।তাতে ওদের দুদিনের ক্ষুদা নিবারন হবে।
--বাহ্!আজব মানুষ আপনি।নিজের শেষ দেহটুকু ও পরের জন্য বিলিয়ে দিতে চান।
-একটা অনুরোধ করবো?
--বলুন।
-আমার ফাঁসির খবরটা যেনো প্রচারিত না হয়।তবে ও জানতে পারলে কষ্ট পাবে।
--চমৎকার তো আপনি!তো পরিচয়টি দেন ওর।
- না তা বলবো না।ও আজ সুখে আছে।আমার লাশ নিয়ে ওর কষ্ট দিতে চাই না। ও ভালো থাকুক।
--আচ্ছা আপনার ফাঁসির খবর পেয়ে,সময় জেনেও একটুও বুক কাপছে না?
-আরে কেঁপে কি হবে।কাঁপলে কি ফাঁসির রশি আমাকে ছেঁড়ে দেবে?
-- না।তা দেবে না।তবু এমন মানুষ কখনো দেখিনি,যে নিজের মৃত্যুর সময় জেনেও হাসি মুখে কথা বলে।আচ্ছা যদি আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়?
- আমি চাই না।তার থেকে আপনারা তৈরি হোন রাত এগারোটা বেঁজে গেছে বারোটার সময় আমার ফাঁসি কার্যকর করার কথা।
--বলুন কি খেতে চান?
-না কিছুই না।খেলে মরতে সময় লাগবে।আর প্রসব পায়খানা হতে পারে।তাতে ডোমদের কষ্ট হবে। তার থেকে এক বদনা পানি দেন জীবনে অনেক দিন ওযু করে নি।আজ করি,আর একটা কুরান দেন বহুদিন চোখে দেখেনি।শেষবারের মতন একটু পড়ি,আর একটু চুম্বন করি।জানি মরার পরও আমার ক্ষমা হবে না।জাহান্নম আমাকে হাতছানি দিচ্ছে।জল্লাদ কে বলবেন দেরী না করতে।যত তাড়াতাড়ি পারে ফাঁসি দিয়ে দিক।
-- বাহ্!আপনি আমাকে অবাক করে দিলেন।নিজের মৃত্যুভয় জয় করে নিলেন।আজ আমিও হুকুমের গোলাম।যদি আমার হাতে কোন ক্ষমতা থাকতো আপনাকে মুক্তি দিতাম।কিন্তু আমি পারলাম না।আমাকে ক্ষমা করবেন।যদি রায়ের আগে এসব জানতে পারতাম তবে আপনার জন্য চেষ্টা করতাম।
-আরে আপনি কাঁদছেন কেনো? মৃত্যু তো আমার হবে আপনার না আর আপনি তো আমার কেউ নন!
-- ভাই হয়তো কেউ নয় কিন্তু আমি সেই জল্লাদ যে আপনার ফাঁসির দঁড়ি টানবো।আজ অবদি বহু ফাঁসি কার্যকর করেছি কিন্তু আপনার মতন মানুষ পাই নি।আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?
-বলুন শুনে দেখি।
--আপনার লাশটা আমার বাড়ির পাশে মসজিদ আছে তার পাসে কবর দিতে চাই।
-আরে কি বলছেন।মসজিদ কষ্ট পাবে আমার মতন জঘন্যতম খুনীর কবর পেয়ে।তার থেকে আমার শেষ ইচ্ছে টুকু পুরন করেন
।আমার লাশ শিয়াল কুকুরে টেনে হিঁচড়ে খাবে।দেশের যুবক যুবতিরা দেখবে তাদের জীবনে শিক্ষা হবে।
জান আপনি তৈরি হন।আমিও তৈরি হয়।

0 মন্তব্য(গুলি):