উপ সম্পাদকীয়
শিক্ষকের হাতে শাসনের প্রতীকী “লাঠি” ফিরুক : সুশিক্ষা, শৃঙ্খলা ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়
-আফজাল হোসেন চাঁদ
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা, আর সেই শিক্ষার কারিগর হলেন শিক্ষক। প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা, স্নেহ এবং শাসনের এক অনুপম মিশ্রণ। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং ‘মানবাধিকার’ বা ‘শিশু মনোবিজ্ঞান’-এর অতি-সরলীকৃত ব্যাখ্যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শাসনের উপাদানটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার যে চরম অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে সমাজ সচেতন মহলে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে-শিক্ষকের হাতের সেই প্রতীকী "লাঠি" কি তবে তুলে রাখা ভুল ছিল? এখানে ‘লাঠি’ মানে শারীরিক নির্যাতন নয়, বরং এটি শৃঙ্খলা ও নৈতিক শাসনের এক শক্তিশালী প্রতীক।
এক সময় আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটি প্রচলিত ধারণা ছিল-‘যেইখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’ এই অমূল্য রতন বা সুনাগরিক গড়ার কারিগর হলেন শিক্ষক। শিক্ষকদের হাতে একসময় একটি প্রতীকী লাঠি থাকত, যা ছিল শাসনের ও শৃঙ্খলার চিহ্ন। সেই লাঠি কেবল বেত ছিল না, ছিল শিক্ষার্থীর বিপথে যাওয়ার পথে এক অমোঘ বাধা। কিন্তু আধুনিক শিক্ষার ডামাডোলে আমরা ‘শাসন’ শব্দটিকে নেতিবাচক করে তুলেছি, যার ফলে আজ শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে সমাজ-সর্বত্রই শৃঙ্খলার চরম ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে উদ্বেগজনকভাবে কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্ববোধ ও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা। আজ সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে অস্থিরতা, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার একটি বড় কারণ হলো শিক্ষাজীবনে সঠিক দিকনির্দেশনা ও কার্যকর শাসনের অভাব। একসময় শিক্ষক ছিলেন শিক্ষার্থীদের কাছে অভিভাবকের মতো। বিদ্যালয় ছিল মানুষ গড়ার কারখানা। শিক্ষকের কথা মানা, নিয়ম মেনে চলা, সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছিল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তখন শিক্ষকের হাতে থাকা “লাঠি” ছিল না ভয় বা নির্যাতনের প্রতীক; বরং তা ছিল দায়িত্ব, নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক কর্তৃত্ব ও শাসনের প্রতীক। শিক্ষকরা যেমন স্নেহ দিতেন, তেমনি প্রয়োজনে কঠোর হতেন। আর সেই কঠোরতার মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল বুঝতে শিখত, জীবনকে গঠন করতে শিখত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে “শাসন” শব্দটিকেই অনেক ক্ষেত্রে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা শুরু হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, শিক্ষকের কঠোরতা মানেই নির্যাতন। ফলে শিক্ষকদের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আজ একজন শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীকে কঠোরভাবে সতর্ক করতেও দ্বিধাবোধ করেন। কারণ মুহূর্তেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হয়, শিক্ষক সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হন, এমনকি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতেও পড়েন। এর ফলাফল হচ্ছে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের নৈতিক কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, “শিক্ষকের হাতে লাঠি ফিরিয়ে দেওয়া” বলতে কোনোভাবেই শারীরিক শাস্তি, সহিংসতা বা অপমানকে সমর্থন করা হচ্ছে না। কারণ শিক্ষা কখনো ভয়ের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। একজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে হয়তো সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু তাতে তার মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। তাই শারীরিক নির্যাতনের কোনো স্থান আধুনিক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থায় থাকা উচিত নয়। এখানে “লাঠি” একটি প্রতীকী শব্দ। এর অর্থ হলো-শিক্ষকের সেই নৈতিক ক্ষমতা, শাসনের অধিকার, শৃঙ্খলা বজায় রাখার সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালিত করার সামাজিক মর্যাদা। শিক্ষক যেন প্রয়োজন হলে কঠোরভাবে ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন, নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন- সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। আজ আমরা দেখতে পাই, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পড়াশোনার চেয়ে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন আসক্তি কিংবা নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে বেশি জড়িয়ে পড়ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমছে, শিক্ষককে অসম্মান করার ঘটনাও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাব, গ্রুপিং কিংবা সামাজিক বিভাজনের শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু শিক্ষকদের জন্য নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীরা কাঁচা মাটির মতো। তাদের যেভাবে গড়ে তোলা হবে, ভবিষ্যৎ সমাজও সেভাবেই নির্মিত হবে। আর এই গঠন প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, আচরণ ও স্বপ্ন গঠনে ভূমিকা রাখেন। তাই শিক্ষককে যদি যথাযথ মর্যাদা, স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা না দেওয়া হয়, তবে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
আমাদের সমাজে বর্তমানে আরেকটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়-অনেক অভিভাবক সন্তানের ভুলকে সহজভাবে নেন কিংবা অন্ধভাবে সন্তানকে সমর্থন করেন। এতে করে শিক্ষার্থীরা ভুল করেও নিজেদের দায় স্বীকার করতে শেখে না। বরং তাদের মধ্যে এক ধরনের দায়িত্বহীনতা তৈরি হয়। অথচ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে একজন শিক্ষার্থীর সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়। একজন শিক্ষক যখন কোনো শিক্ষার্থীকে সতর্ক করেন, তখন অভিভাবকের উচিত বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা এবং সন্তানের কল্যাণের দৃষ্টিতে বিচার করা। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে। শাসন যেন কখনো অপমান, বৈষম্য বা ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ না হয়। শিক্ষার্থীর আর্থিক অবস্থা, ধর্ম, লিঙ্গ, অঞ্চল বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন শিক্ষক হবেন ন্যায়পরায়ণ, মানবিক ও সহানুভূতিশীল। কারণ একজন শিক্ষকের আচরণই শিক্ষার্থীর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা এক বিষয় নয়। একজন আদর্শ শিক্ষক সেই ব্যক্তি, যিনি ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীর মন জয় করেন, আবার প্রয়োজন হলে দৃঢ়তার সঙ্গে ভুল সংশোধন করেন। কোমলতা ও শৃঙ্খলার এই ভারসাম্যই প্রকৃত শিক্ষার সৌন্দর্য। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেও দেখা যায়, সেখানে শৃঙ্খলাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা নিয়ম ভঙ্গ করলে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে সেই ব্যবস্থা হয় মানবিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈষম্যহীন। আমাদের দেশেও এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষকরা সম্মান পাবেন, শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকবে এবং শিক্ষা হবে মানবিক ও শৃঙ্খলাভিত্তিক।
আজ প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার। কেবল জিপিএ-৫ বা পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন নৈতিক মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক ও মানবিক প্রজন্ম। আর এটি অর্জন করতে হলে শিক্ষককে তাঁর যথাযথ অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষকের কণ্ঠ যেন গুরুত্ব পায়, তাঁর শাসন যেন ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন সত্যিকার অর্থে মানুষ গড়ার জায়গা হয়ে ওঠে। তাই সময়ের দাবি হলো-শিক্ষকের হাতে প্রতীকী “লাঠি” ফিরিয়ে দেওয়া; অর্থাৎ তাঁকে এমন নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা দেওয়া, যার মাধ্যমে তিনি বৈষম্যহীন, মানবিক ও দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষার্থীদের শাসন ও দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। কারণ সুশিক্ষা কখনো কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা গড়ে ওঠে শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক আচরণের সমন্বয়ে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষককে দুর্বল করে দিয়ে কখনো শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই আসুন, আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলি যেখানে থাকবে জ্ঞান, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সুন্দর সমন্বয়-যেখানে শিক্ষকের শাসন হবে ভালোবাসার, আর শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠা হবে মর্যাদা ও মানবিকতার আলোয়।

0 মন্তব্য(গুলি):