আফজাল হোসেন চাঁদ, প্রকাশক ও সম্পাদক, চাঁদনী বিডি ডেস্ক :
ডিজিটাল সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। দেশের উন্নয়নের আধুনিকায়নের ধারায় ক্রমাগতই মানুষের গতি ও রুচির পরিবর্তন হচ্ছে। কম সময়ে বেশি কাজ করার প্রবণতা এগিয়ে চলেছে। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় বা কালের বিবর্তনে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঢেঁকির ঐতিহ্য বিলুপ্তপ্রায়। শহর ও গ্রাম অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান পাল্টে যাচ্ছে। কুঁড়েঘরের স্থানে হয়েছে দালান-কোঠা। মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে নানা আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ব্যবহার হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল ঢেঁকি। তখন ঢেঁকির কদরও কম ছিল না। এখন প্রতিটি বাড়িতে তো দূরের কথা, কয়েকটি গ্রাম মিলিয়ে একটি বাড়িতেও ঢেঁকি আর আছে কিনা তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়! আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। বর্তমান প্রজন্ম ঢেঁকি শব্দটির সাথে খুব একটা পরিচিত নয়। এক সময় মোরগ ডাকার ভোরের সাথে সন্ধি করে বাড়ির নারীদের দ্বারা শুরু হত ঢেঁকির চাউল গুড়োর কাজ। ঢেঁকিতে শুধুই যে চাউল গুড়ো হত তা নয়। চাউল গুড়োর কাজে গ্রামের নারীরা পরস্পরকে সহায়তা করতেন, তারা তাদের সুখ-দুঃখগুলো তাদের কন্ঠের করুণ সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করতে দেখা যেত এছাড়াও ঢেঁকির ঢাকুর ঢুকুর শব্দে ঘুম ভাংতো গ্রাম বাংলার মানুষের।
সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাত দৈর্ঘ্য। আর পৌনে ১ হাত চওড়া। মাথার দিকে একটু পুরু এবং অগ্রভাগে সরু। এর মাথায় এক হাত কাঠের ওচা বা দস্তা দেওয়া থাকে এবং মাথায় লাগানো থাকে লোহার গুলা। গুলার মুখ যে নির্দিষ্ট স্থানে পড়ে সে স্থানকে গড় বলে। চাউল গুড়াতে ন্যূনতম দু’জন লোকের প্রয়োজন হয়ে থাকে। ঢেঁকি তৈরিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গাব কাঠ, বেল কাঠ, কাঁঠাল গাছের কাঠ ব্যবহার হয়। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে গাব গাছ, বেল গাছ কমে যাওয়ায় ঢেঁকি তৈরি ও এর ব্যবহার আশংকাজনক হারে কমে যাচ্ছে। গ্রামের নারীরা এখনও পিঠা তৈরির জন্য চালের গুড়া করে। যে সব ধরনের পিঠা (পুলি, ধাবড়া, ভাপা, তেলের পিঠা) সহ হরেক রকমের পিঠা। সকল প্রকার পিঠা তৈরিতে চাউলের গুড়া দিলে পিঠা সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত হয় এবং বৈদ্যুতিক মেশিন দ্বারা চাউল গুড়া করা পিঠা খেতে ভাল হয় না। এছাড়াও বড় ধরনের অনুষ্ঠান যেমন- বিয়ে, মেহমানি, হাইট্টারা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে মসলা (মরিচ, হলুদ, জিরা) গুড়ো করার ক্ষেত্রেও ঢেঁকির ব্যবহার করতে দেখা যেত।
আর এখন হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার মানুষের অতি পরিচিত ঢেঁকি নামক অযান্ত্রিক মেশিন। বর্তমানে বৈদ্যুতিক মেশিন দখল করে নিয়েছে ঢেঁকির ঐতিহ্যের স্থান। যন্ত্রনির্ভর এ যুগেও কিছু কিছু গ্রামের বাড়িতে এখনও কাঠের তৈরি ঢেঁকির ব্যবহার দেখা যায়। একটি ঢেঁকি কয়েক যুগ ব্যবহার করা যায়। শুধুমাত্র কালিটি (উচা) কয়েক বছর পরপর পরিবর্তন করলেই চলে। ঢেঁকিতে শব্দ দূষণ মেশিনের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম হয়ে থাকে। মেশিনের মাধ্যমে মানুষের তেমন কোন পরিশ্রম করতে দেখা যায় না। কিন্তু পরিশ্রম কমে যাওয়ায় গ্রামের মানুষ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সম্মূখীন হচ্ছে। ঢেঁকিতে চাউল গুড়োর মাধ্যমে মানুষের পারস্পারিক সম্পর্ক ও আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং সামাজিক বন্ধন লোপ পাচ্ছে।
যশোরের ঝিকরগাছা পৌরসদরের কাটাখাল রূপনগরের গৃহনী ফরিদা ইয়াসমিন পলি বলেন, ঢেঁকি চাটা চাল খুবই সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত। স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি, গ্রামীণ সংস্কৃতি চর্চা, গ্রামীণ মানুষের পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নয়ন, আন্তঃনির্ভরশীলতা, সুখ-দুঃখের কথা সহযোগিতায় ঢেঁকির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। নিজেদের ইচ্ছে মত প্রয়োজনের সময় ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো, বাচ্চাদের জন্য ঘরের খাবার তৈরি, মেহমানদের আপ্যায়নের জন্য পিঠা তৈরি করতে ঢেঁকিতে চালের গুরুত্ব বেশি। এমন কি ডাক্তাররাও আমাদের এ চালের ভাত খাওয়ার পারামর্শ দেন। আমাদের গ্রামীণ সমাজে চাল গুঁড়ো করার জন্য ঢেকির বিপ্ররীতে মেশিন উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রামীণ প্রযুক্তির ঢেঁকির প্রচলন বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ঢেকি রক্ষার্থে ও পরিবারের মুখে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তৈরি করতে এটা সংরক্ষণে আমাদের মনোবল প্রয়োগ করতে হবে।

0 মন্তব্য(গুলি):