২০১৭ সাল।
আগামীকালকে ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকি। আমি তখন থাকি নারায়নগঞ্জ-এর সিদ্ধিরগঞ্জ থানার চৌধুুরি বাড়ীর বৌ বাজারে। গ্রাম থেকে ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি মিজানুর ভাই আমাকে ফোন দিল কালকে কাঙ্গালীভোজ আসপানতো মিয়া ভাই, আমরা চাল তুলেছি কাঙ্গালীভোজ করবো। তোমার না থাকলে কিন্তু হবে না। আমি কোন কিছু না ভেবে বলে দিলাম আসবো ভাই, চিন্তুা করেন না। ১৫ই আগস্ট খুব ভোরে ফজরের আজান দিচ্ছে। আমি ঘুম থেকে উঠলাম আজান শুনেই। মাঝে মাঝে নামাজ পড়ি, তবে সব সময় না। ঐ দিন ফজরের নামাজ পড়লাম না, যশোরে যেতে হবে। খুব দ্রুত রেডি হলাম, যেতে হবে যাত্রাবাড়ী। তারপর বাস ধরে যেতে হবে মাওয়াঘাট। এই ভেবে ফ্রেস হয়ে টাকা পয়সা মানিব্যাগে ঢুকালাম। আমার ওয়াইফ-কে বল্লাম তুমি স্বাধীনের দিকে খেয়াল রেখ। স্বাধীন আমার একমাত্র ছেলে ওর বয়স তখন ০৬ মাস। বলে আমি বাসা থেকে আল্লহর নাম নিয়ে বের হলাম। বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে, আকাশ তেমন পরিষ্কার ছিলো না। মেইন রাস্তায় এসে সিএনজি করে আসলাম চিটাগাং রোর্ড। এরপর বাসে উঠে আসলাম যাত্রাবাড়ী। যাত্রবাড়ী এসে দেখি, ইলিশ বাস কাউন্টারের লাইনে দাঁড়ানো অনেক লোক গ্রামের দিকে যাবে। আমি আনুমানিক ২৫ জন লোকের পিছনে সিরিয়ালে টিকিটের জন্য দাঁড়ালাম। তারপর টিকিট নিয়ে, বাসে উঠে বসলাম। কিছুক্ষন পরে বাস ছাড়লো। বাস খুব একটা বেশি জোরে যাচ্ছেনা, কারণ তখন সামান্য গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বাসের ভিতরে অনেকেই রেগে যাচ্ছে, বলছে ড্রাইভার ভাই একটু জোরে চালান।

এই ভাবে গেলে আমাদের অনেক সময় লেগে যাবে। এই ভাবে ইলিশ গাড়ী চলে না, ড্রাইভার কিছু বলেনা সে নিজের মতই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দু’পাশেই পদ্মা সেতুর রাস্তার কাজও চলছে। প্রায় দেড় ঘন্টা পরে মাওয়া ঘাটে এসে পৌছালাম। আমার ব্যাগটা কাধে নিয়ে ঠেলাঠেলি করে নামলাম। বাস থেকে নেমে দেখি প্যান্টের পিছনের পকেট হালকা লাগছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখি, আমার ম্যানিব্যাগ নাই। আমার ম্যানিব্যাগ গেল কোথায় ? দৌঁড়ে আবারও বাসে উঠলাম তখন বাসে ড্রাইভার আর হেলপার ছাড়া বাসে আর কেউ নাই। আমি ড্রাইভারকে বললাম, আমার ম্যানি ব্যাগটা নেই ! ড্রাইভার বলেন কি ভাই! ম্যানিব্যাগটা মেরে দিলো। হেলপার বললো ও আর আপনি পাবেন না ভাই! অসহায় মানুষের মত আবারো বাস থেকে নামলাম, তখন আর কোন তড়িঘড়ি ছিলনা। কি করবো, ভেবে পারছিলাম না। যশোরে যাবো টাকা লাগবে! তবে ম্যানিব্যাগে বেশি টাকা ছিল না, মাত্র চার হাজার টাকার মত ছিল। কিন্তু ঐ চার হাজার টাকা তখন আমার কাছে অনেক টাকা আরো ম্যানিব্যাগে আরো প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র ছিল। তাই অনেক হতাশ লাগছিল। ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবলাম কাকে ফোন দেওয়া যায়। এই ভেবে আমি আমার এক কাজিনকে ফোন দিলাম। ওর নাম লিন্টু। লিন্টু ভাইকে বললাম আমার ম্যানিব্যাগটা মেরে দিয়েছে! আমি এখন মাওয়া ঘাটে বসা আছি। কাছে কোন টাকা-পয়সা নাই। আমার কিছু টাকার দরকার। ও শুনে একটু আফসোস করে বললো আমি পাঁচশত টাকা দিতে পারবো তুমি একটা বিকাশ নাম্বার দে। আমি বিকাশ নাম্বার দিলাম পরে তার থেকে পাঁচশত টাকা নিলাম। মন ভিষন খারাপ আর মাথা গরম। এই ভাবে মানিব্যাগ খোয়া যাবে ভাবতে পারিনি। মনকে বোঝালাম যা গেছে তা আর ফিরে পাওয়া যাবেনা। পাঁচশত টাকা হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে স্প্রিড বোর্ড কাউন্টারের দিকে এলাম। টিকিট কাউন্টারে দেখি, একজন লোক কাউন্টারের লোকের সাথে রাগারাগি করছে, কারণ প্রতি টিকিটে একশত টাকা বেশি নিচ্ছে। শুনে আমার মাথা আর একটু গরম হয়ে গেল। পকেটে মাত্র পাঁচশত টাকা এখানে যদি একশত টাকা বেশি নেয় তাহলে আমার যশোরে যাওয়া কষ্ট হয়ে যাবে। আমি কাউন্টারে যেয়ে রাগ করে বললাম আপনারা মানুষকে কি পাগল পেয়েছেন! ইচ্ছা হলো আর ওমনি একশত টাকা বাড়িয়ে দিলেন। কাউন্টারের ভিতর থেকে রেগে একজন বললো, কথা কম গেলে টাকা দেন না গেলে সামনে থেকে সরে যান। আমি আরো একটু রেগে বললাম কথা কম মানে, আপনারা আর কত মানুষকে ধোঁক দিবেন! কাউন্টারের বাইরে একজন লোক দাঁড়ানো ছিল, ঐ লোকটাও ওদের লোক। ঐ লোক আমাকে বললো ভিতর থেকে না বললো কথা কম, বেশি কথা বললি কেন, ঘাঁড় ধরে নদীতে ফেলে দিবানে। আমি একটু চুপ থেকে টিকিট নিলাম। তারপর বললাম, আর কদিন খাবি খাঁ। পদ্মা সেতুর কাজ হচ্ছে, পদ্মা সেতু হলে কি খাবি দেখবো। আমার কথা শুনে বাইরে থাকা লোক ভিশন রেগে গেল। আমি বুঝতে পেরে আর কোন কথা বল্লাম না, নিচে নেমে গেলাম। একজন লোক আমার টিকিটের মুড়ি ছিড়ে নিল। আমি বোর্ডে যেয়ে বসলাম। তখন বোর্ডে মাত্র আট জন লোক। আরো আট-নয় জন হলে ছাড়বে বোর্ড। আমার পাশে একজন মুরুব্বি বসা ছিল। সামনে একজন গর্ভবতি নারীর সাথে তার স্বামী ছিল। ঐ বোর্ডে একজন বললো ভাই প্রায় সকালে ওরা একশত টাকা টিকিটে বেশি নেয়। আমরা কত অসহায়, কোন প্রতিবাদও করতে পারিনা। নিরবে মেনে নিতে হয়। আমি বললাম ওরা মানুষের বাচ্চা না, নিক আর কতদিন নিবে। পদ্মা সেতু হলে তো আর নিতে পারবে না। বোর্ডের একজন বললো সত্যিই সত্যিই কি পদ্মা সেতু হবে ভাই। আর একজন বললো, এতো সহজ না। যে দেশে মন্ত্রিরা টাকা মেরে খায়, সেই দেশে কিভাবে হবে পদ্মা সেতু! আমার পাশে থাকা মুরব্বি সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলে উঠলো, আপনি শেখ হাসিনা-কে এখনো চেনেনা, ও শেখ’র বেটি, ঠিকিই পদ্মা সেতু করেই ছাড়বে। একজন বললো আগে করুক না, আর একজন বললো আমাদের পকেটের টাকা দিয়ে করবে, সরকারের টাকা কনে। আমি প্রতিবাদ করে বললাম পদ্মা সেতু হইলে বুঝতে পারবেন সরকারের টাকা আছে কি নেই। সরকার কে এত দুর্বল ভাবছেন কেন আপনারা ? একজন নতুন লোক বোর্ডে এসে বললো আজকেও একশত টাকা বেশি নিলো। আমি প্রায় যায় এরা মানুষকে একেবারে জিম্মি করে ফেলেছে। আমি বললাম ওরা মানুষ না ওরা পশুর চেয়েও খারাপ। বোর্ড ভরে গেছে ছাড়বে এমন সময় ঐ কাউন্টারের বাইরে থাকা লোক আমাকে ফলো করে বললো এই তোর টিকিট টা ফেরত দে। বোর্ডের সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো, ঐ লোক বললো তোকে নিয়ে এই বোর্ড যাবে না। আমি কড়া ভাষায় বললাম টিকিট ফেরত দিব মানে। তখন ঐ লোক আমাকে গালী দিয়ে বলল, সেই শুরু থেকে পদ্মা সেতু পদ্মা সেতু করে যাচ্ছিস। পদ্মা সেতু কি তোর বাপ-মায়ে করতেছে। আমি ওর কথা শুনে ঘাবড়ে গেলাম, সত্যিই সত্যিই ওকি আমাকে বোর্ড থেকে নামিয়ে দিবে। তখন ও আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো টিকিট ফেরৎ দিয়ে ঐ লঞ্চে যা। বোর্ডের ভিতরে থাকা একজন লোক আমার পক্ষ নিয়ে বললো, ওকি টিকিট ছাড়া বোর্ডে উঠেছে নাকি! এই ড্রাইভার তুই বোর্ড ছাড়। তারপর একজন বললো ভাই টিকিট ফেরৎ দিবেন না। ওদের বিরুদ্ধে আমরা কোন কথা বলতে পারিনা। ড্রাইভার কে একটু কড়া ভাষায় বললো এই বেটা বোর্ড ছাড়। তখন অনেকেই আমার পক্ষ নিল ড্রাইভার বোর্ড ছাড়তে বাধ্য হলো। কিছুদুর যেতে না যেতেই বোর্ড বন্ধ হয়ে গেল। একজন বললো ওদের নাটক শুরু হয়েছে। পদ্মার বুকে তখন বেশ কিছু বড় বড় মেশিন দেখে বুকটা ভরে গেল। মনে হচ্ছিল পদ্মা সেতু এই বুঝি হয়ে গেল। বোর্ড স্ট্রার্ট হচ্ছে না, গর্ভবতী নারীটা নদীর পানিতে ভিজে যাচ্ছিল। আমার হাতে থাকা একটি পত্রিকার পেজ ওনাকে দিলাম। বড় বড় মেশিন দেখে উনি বললো ভাই আসলে কি পদ্মা সেতু হবে! আমি বললাম হবে মানে আসলেই হবে, আপনার সন্তান এই পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াত করবে। বলতে বলতে বোর্ড স্টার্ট হয়ে গেল। মনেমনে বললাম আল্লাহ তুমি শেখ হাসিনার হাতকে এমন ভাবে শক্ত করে দাও, উনি যেন পদ্মা সেতু করে মানুষকে দেখিয়ে দিতে পারে, আমরাও পারি। এই পদ্মা সেতু হয়ে গেলে আমি ওনাকে একটা উপহার দিব। তখন আমি ভাবিনি ওনাকে কি উপহার দিব। এই ভাবনা টা বুকে নিয়ে চার বছর পার করলাম। পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় শেষ। এখন ওনাকে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের মানুষের পক্ষ থেকে ওনাকে কিছু একটা উপহার দিতে চায়। আমি একজন অতি সামন্য র্ফাম উদ্যোক্তা মাত্র।
-লেখক : মোঃ সাইফুর রহমান সাইফ, সভাপতি, বোধখানা মহিলা দাখিল মাদ্রাসা, ঝিকরগাছা, যশোর।
0 মন্তব্য(গুলি):